আমরা অবিরাম পরিবর্তনের এক পৃথিবীতে বাস করছি। নতুন মহানগর গুলোতে অভিবাসীদের বিশাল চাপ পূর্ণ করে চলেছে আকাশচুম্বী অট্টালিকা এবং সুবিশাল বস্তি সমূহ। জ্বালানী এবং খাদ্যের জন্য বুভুক্ষিত ক্ষুধা, অপ্রত্যাশিত জলবায়ু পরিবর্তন এবং সবই ঘটছে এই পৃথিবীতে, যেখানে জনসংখ্যা এখনও বেড়ে চলেছে। আমরা কি উদ্বিগ্ন হব? নাকি ভীত? কিভাবে এসব থেকে ধারণা পাওয়া যাবে? আমাদের এই গ্রহে এখন সাত বিলিয়ন মানুষ বাস করে ....... সুন্দর না ? কিন্তু যখন কিছু মানুষ পৃথিবী এবং এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তা করে, তারা আতঙ্কিত হয় ! অন্যরা এটা নিয়ে একেবারেই চিন্তা না করতে পছন্দ করে। আমি আজ রাতে বাস্তব অবস্থাটা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে যাচ্ছি। আমার নাম হান্স রসলিং। আমি একজন পরিসংখ্যানবিদ ... না, না, না, না ...... বন্ধ করবেন না ! কারণ সকল দেশের সর্বশেষ তথ্য নিয়ে আমি পৃথিবীকে নতুন ভাবে উপস্থাপন করতে যাচ্ছি। আমি বলতে চলেছি পৃথিবীর জনসংখ্যা কিভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের পৃথিবী সম্পর্কে আজকের উপাত্ত আমাদেরকে কি বলে। আমরা অনস্বীকার্য ভাবে বিশাল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন কিন্তু আশার কথা হচ্ছে ভবিষ্যত অতটা তমসাচ্ছন্ন নাও হতে পারে এবং মানবজাতি ইতিমধ্যে আপনাদের অনেকের ধারণার থেকেও ভালো করতে শুরু করেছে! আতঙ্কিত হবেন না! জনসংখ্যার বাস্তব অবস্থা অধ্যাপক হান্স রসলিং এর সাথে শিশুরা ... প্রত্যকেই একেকটি আশির্বাদ। কিন্তু অনেকেই মনে করেন জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অনেকে আবার জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কথাও বলেন। তারা কি সঠিক? তাহলে জনসংখ্যা নিয়ে আজ আমরা কোথায় আছি? এবং কিভাবে এখানে এলাম? আমি আপনাদেরকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে বসবাস করা মানুষের ইতিহাস বলতে যাচ্ছি ... বেশ, অন্তত বিগত ১০০০ বছরের আমরা শুরু করছি। আমি আপনাদেরকে দুইটি অক্ষ দিচ্ছি। এই অক্ষটি সময়-বছরে এবং এটি বিশ্ব জনসংখ্যা-বিলিয়নে। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা অনুমান করেন যে, খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দে, যখন মানুষ কৃষিকাজ শুরু করেছিল তখন পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০ মিলিয়ন। কল্পনা করুনঃ ১০ মিলিয়ন! আজকের সুইডেন যেমন! শুধুমাত্র সুইডিশদের দুনিয়া! কিন্তু তারপর, সহস্রাব্দের সাথে সাথে, আরও কৃষক, খাদ্য, মানুষ ...... এবং মহান সম্রাজ্যের উত্থান। মিশর, চীন, ভারত ... এবং সবশেষে ইউরোপ! এবং জনসংখ্যা বাড়তে থাকলো, খুব ধীর গতিতে। এবং আমি এখানে থামছি, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে। কারন ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ ছিল সেই বছর যখন পৃথিবীর জনসংখ্যা ১ বিলিয়ন পুর্ণ হয়। কল্পনা করুন ... হাজার বছর ধরে জনসংখ্যাবৃদ্ধির হার ছিল এক শতাংশের ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ মাত্র ! কিন্তু ১৮০০ সালে, শিল্প বিপ্লব এর সাথে-সাথে, সবকিছুই বদলে গেল এবং জনসংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করল। ১০০ বছরের সামান্য বেশি সময়ে, এটি ২ বিলিয়ন এ পৌঁছল। এবং তারপর, যখন আমি স্কুলে পড়তাম, জনসংখ্যা ৩ বিলিয়ন হল। এবং অনেকে বললঃ 'এ গ্রহ আর বেশি মানুষের ভার বইতে পারবে না।' এমনকি বিশেষজ্ঞরাও তাই বলল। কিন্তু যা ঘটেছিল তা হচ্ছে ... আমরা হলাম ৪ বিলিয়ন... ৫ বিলিয়ন... ৬ বিলিয়ন... ৭ বিলিয়ন! দেখুন... বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা আমার জীবদ্দশাতেই যোগ হয়েছে। এবং সংখ্যাটি এখনও বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, অধিকাংশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটছে এশিয়ার দেশগুলোতে। যেমন এখানে বাংলাদেশে ...... যেখানে জনসংখ্যা আমার জীবদ্দশাতেই তিনগুন হয়েছে। ৫০ মিলিয়ন থেকে ১৫০ মিলিয়নেরও বেশি। এটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জনাকীর্ণ রাজধানী ঢাকায় ইতিমধ্যে প্রায় ১৫ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করছে। এখানকার মানুষ, হোক শহর কিংবা গ্রাম, পরিবারের আকার সম্পর্কে ভীষণ উদ্বিগ্ন। কিন্তু এক নতুন বাংলাদেশের উদয় হচ্ছে ... যেমন খাঁন পরিবার। মা তাসলিমা, মেয়ে তানজিলা এবং ছোট্ট সাদিয়া। এবং বাবা হান্নান। "মহিলাদের সাজার জন্যে বহুত টাইম লাগে, পুরুষদের তো এতো লাগেনা।" "হয়েছে তো রে বাবা! হাত দিয়ে মুছে ফেলালে দিয়ে কি লাভ হবে?" তাসলিমা এবং হান্নান দুজনেই বৃহৎ পরিবার থেকে এসেছে। কিন্তু তারা মাত্র দু'টি সন্তান নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশে এখন একটা স্লোগান আছে ... "দু'টি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়।" আমার ভাগ্য ভালো যে আমার দুইটা সন্তান। অনেক সন্তান হলে তো তাদের খরচ দিতে পারতাম না। দু'টি সন্তান নিয়ে, তাদের মনের মত বড় করতে পারছি। আমার পকেট খালি হয়ে গেছে! তাসলিমা এবং হান্নান বৃহৎ পরিবার থেকে বের হয়ে আসা সংস্কৃতিক পরিবর্তন এর অংশ। এবং তাসলিমার জন্যে এটি একটি কাজে রূপ নিয়েছে। সে সরকারের পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবায় কাজ করে যা প্রত্যেক গ্রামে তার মত নারীকে নিযুক্ত করেছে। সে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে অন্যদেরকেও ছোট পরিবার গঠনের ব্যাপারে সহায়তা করে। "ঋতুস্রাব হয়েছে আজ কত দিন?" "গত মাসের ২২ তারিখে" "এর পরে আর কোন পদ্ধতি নেন নাই?" "তাহলে সমস্যা হয়ে যাবে না?" "আমি সহজে প্রেগনেন্ট হই না।" "তারপরেও আপনার তো দুইটা বাচ্চা হয়ে গেছে।" "আমি সময়ের অভাবে যাই না" তাসলিমা দেয় পরামর্শ, মানসিক সহায়তা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন ভাবে বিভিন্ন ধরনের নিরোধক। "আপনার তো তিনটা মেয়ে - এখন কি আর বাচ্চা নিবেন?" "আমি বলতে পারি না। এর বাবা বলতে পারে। "বাচ্চা জন্মদান করেন আপনি। ওর বাবা জানবে কেন?" "কষ্ট তো আপনার করতে হয়।" "কষ্ট কে করে?" "কষ্ট আমি করলাম। কিন্তু সে যদি পুত্রের আশা করে, তো আমার কি করার আছে? "পিল দিয়ে দিই। মাসিক হবার সাথে সাথেই খাওয়া শুরু করবেন।" "যারা কম শিক্ষিত, তারা বুঝতে চায় না ... ... কিন্তু বুঝাতে হয়।" তাহলে জন্মহার কমাতে তাসলিমা এবং বাংলাদেশ কতটা সফল হয়েছে? অর্থাৎ, জনপ্রতি মহিলায় শিশুর সংখ্যা। সুইডেনে আমরা গ্যাপমাইন্ডার ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছি পৃথিবীর তথ্যগুলি এমন ভাবে উপলব্ধ করতে যাতে সবাই তা বুঝতে পারে। আমি আপনারদেরকে দেখাতে পারি, বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং সেখানে যা ঘটেছে। এখানে, একটি অনুভূমিক অক্ষ, নারী প্রতি শিশুর সংখ্যা। ১,২ থেকে শুরু করে ৭, ৮ পর্যন্ত, এবং এখানে একটি উল্লম্ব অক্ষ, যেটা জীবন-কাল, প্রত্যাশিত আয়ু, এবং একটি শিশুর প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল। ৩০ থেকে শুরু করে ৯০ পর্যন্ত। আমরা শুরু করছি ১৯৭২ থেকে ... বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর, স্বাধীনতার প্রথম পূর্ণ বছর। সে বছর, বাংলাদেশ ছিল এখানে, নারী প্রতি ৭ সন্তান, এবং ৫০ বছরের কম আয়ুষ্কাল। তাহলে স্বাধীনতার পরে কি ঘটেছে? বাংলাদেশে জীবনকাল কি দির্ঘায়ীত হয়েছে? শিশুর সংখ্যা কি কমেছে? এখানে সেই তথ্য। শুরু করছি সত্যিই, জীবনকাল দীর্ঘায়ীত হয়েছে এবং শিশুর সংখ্যা, কমের দিকে ...৬...৫ এনং আরও দীর্ঘ জীবন ......৪.........৩ এনং এটি এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ এ। এটি ২.২। এবং প্রত্যাশিত আয়ু ৭০ বছর। সত্যি অসাধারন। ৪০ বছরে বাংলাদেশ গিয়েছে ৭ থেকে শুরু করে ...৬... ৫... ৪... ৩... ২... যা বাংলাদেশে ঘটেছে, তা সত্যিই অলৌকিক। কিন্তু শুধু কি বাংলাদেশেই? আমি আপনাদেরকে পুরো বিশ্বের চিত্রটিই দেখাচ্ছি। ৫০ বছর পিছনে যাচ্ছি, ১৯৬৩ সালে। এখানে সকল দেশ। সবুজ গুলো আমেরিকা, উত্তর এবং দক্ষিন। হলুদ ইউরোপ, পূর্ব এবং পশ্চিম। নীল আফ্রিকা, সাহারার উত্তর ও দক্ষিন। লালে এশিয়া, এবং আমরা অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডও অন্তর্ভূক্ত করেছি। বুদবুদ এর আকার জনসংখ্যার আকার দেখাচ্ছে। দেখুনঃ ওখানকার বড়গুলো চীন এবং ভারত। এবং তাদের পেছনেই বাংলাদেশ। ১৯৬৩ সালে পৃথিবীতে নারী-প্রতি গড়ে শিশু সংখ্যা ছিল ৫। কিন্তু এটি ছিল একটি বিভক্ত দুনিয়া... দেখতে পাচ্ছেন? এখানকার দেশগুলোতে, উন্নত দেশ সমূহে, ছিল ছোট পরিবার এবং দীর্ঘ জীবনকাল। আপনাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ !